Click Below

Breaking

Know more

Search

সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

প্রাক আধুনিক যুগে চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল? || B.A HISTORY HONOURS



 প্রশ্ন,

প্রাক আধুনিক যুগে চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল?

প্রাক আধুনিক যুগ অথবা বলা যেতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত চীনের অর্থনীতি ছিল প্রধানত কৃষিভিত্তিক। পরবর্তীকালে কৃষিভিত্তিক শিল্প চীনের অর্থনীতি কে রূপায়িত করে।


• চীনে প্রাক আধুনিক যুগে কৃষিই জীবনধারণের প্রধান উৎস থাকায় তখন আবাদী জমি এবং কৃষক উভয়ই চীনের অর্থনৈতিক জীবনে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে। জমির মালিকানা ছিল ব্যক্তিগত। তৎকালীন সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী একটি পরিবারের সকল পুত্র সন্তানের পারিবারিক জমির উপর সমপরিমাণ দাবি স্বীকৃত হওয়ায় পিতার মৃত্যুর পর সকল পুত্রের মধ্যে পৈত্রিক জমি সমানভাবে বন্টিত হয়। ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খন্ড জমি এক একজনের অংশে পড়তো। আবার মাথাপিছু জমির পরিমাণ কেবলমাত্র যে প্রয়োজনে তুলনায় সামান্য ছিল, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে সেরূপ জমির অবস্থান হত বিক্ষিপ্ত। পরিনামে কৃষককে নিপুণতার সঙ্গে এবং নিবিড়ভাবে জমি আবাদ করতে হতো। জমির স্বাভাবিক উর্বরতা, জল সেচনের সুযোগ এবং জমিতে সারব্যবস্থার সত্বেও জমির ফলন সংসারের অভাব মেটানোর পক্ষে আদৌ সন্তোষজনক ছিল না। ফলে কোনো কৃষক পরিবার দুর্দিনের অভাব মেটাবার জন্য কোনো সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করতে পারত না। প্রতি বৎসরের কৃষিজাত শস্যের আয় থেকে কৃষককে বাৎসরিক ব্যয় সংকুলান করতে হতো। যথা - বিজ ক্রয়জনিত ব্যয়, চাষের উপযোগী যন্ত্রপাতি মেরামত বা ক্রয় জনিত ব্যয়, জন্ম মৃত্যু বিবাহ উপলক্ষে অপরিহার্য ব্যয়। ফলে কৃষকের জীবন ছিল কষ্ট ক্লিষ্ট। অতিবৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টি হেতু শস্যহানির বৎসরে স্বাভাবিক কারণেই দুর্ভিক্ষ দেখা দিত। সেই সঙ্গে দেখা দিত মড়ক। গাছের মূল প্রভৃতি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে কিছুকাল চলতো, পরবর্তী অবস্থা ছিল অনাহার ও অসহায় অবস্থায় মৃত্যুবরণ। আহার্য সংগ্রহে অসমর্থ হয়ে পিতা তার কন্যা সন্তানকে ক্রীতদাসী হিসেবে ধনী গৃহে বিক্রয় করতে বাধ্য হতেন। কৃষক পরিবারের সন্তানদের অধিক্য হেতু এবং জীবন ধারণের উপযোগী আবাদি জমির পরিমাণ প্রয়োজনমতো না হওয়ায় সংসার প্রতি পালনের জন্য কৃষককে কঠোর শ্রম স্বীকার করে নানাভাবে জীবিকা অর্জন করতে হতো।


• তখন জনসংখ্যার তৃতীয় চতুর্থাংশ গ্রামে বাস করত। গ্রামবাসীর প্রধান মূলধন ছিল জমি। জমিতে যে সমস্ত উৎপাদিত হতো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চা এবং রেশম এর জন্য তুঁত গাছ। চা এবং রেশম রপ্তানি করা হত। এই জাতীয় উৎপাদনের জন্য শ্রমিকের নির্বিচ্ছিন্ন যোগদান প্রয়োজন হতো। জমি ব্যতীত অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বন সম্পদ, মৎস্য, সীমিত খনিজ সম্পদ। যথা - কয়লা, লৌহ, তাম্র, টিন, শিশা। তখন যুব বয়সের শ্রমিকের কোনো অভাব ছিল না। কারণ অষ্টাদশ শতকে চীনের জনসংখ্যা দ্রুত বর্ধিত হয়। অভাব ছিল মূলধনের এবং প্রয়োজন মত আবাদি জমির। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার অনুপাতে জমির পরিমাণ ছিল সীমিত। ফলে জনগণকে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে হতো। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা দূরীকরণের অন্তরায় ছিল মূলত দুটি। যথা- বৃহৎ পরিবারে সঞ্চয়ের অসুবিধা এবং গ্রামবাসী ও শহরবাসীর মধ্যে পারস্পরিক উন্নতি কল্পে সহযোগিতার অভাব। তখন সমাজের আদর্শ ছিল বৃহৎ পরিবার গঠন। পরিবারের প্রধান অর্থাৎ পিতার মৃত্যুর পর একমাত্র জৈষ্ঠ পুত্র যে সমগ্র পৈত্রিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন, এমন কোন প্রথা তখন বিদ্যমান ছিল না। পড়ন্তু পৈত্রিক সম্পত্তি সমভাবে বন্টিত হয়‌ সকল পুত্র সন্তানের মধ্যে - যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। সাধারণত একটি পরিবারের পুত্র সন্তানের সংখ্যা হতো অধিক। ফলে এক পুত্র যে পরিমাণ জমি উত্তরাধিকারী সূত্রে অধিকার গ্ৰহন করত তা এতই স্বল্প হত যে প্রাপ্ত জমির সমগ্ৰ উৎপাদনই সংসার প্রতিপালনে ব্যায়িত হয়ে যেত, কোনো উদ্বৃত্ত থাকতো না। সুতরাং পরিবারের কোনো সঞ্চয় হত না। 


• প্রাক আধুনিক চীনে যে ধরনের ব্যবসা প্রচলিত ছিল তা ছিল স্থানীয় অর্থাৎ শহরকেন্দ্রিক। প্রতি শহরাঞ্চলেই বাজার অর্থাৎ ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র থাকতো। এরূপ বাজার বসত তিন চার দিন অন্তর। সেখানে স্থলপথের পশু চালিত গাড়ি এবং জলপথে ছোট ছোট নৌকার সাহায্যে নানাবিধ দ্রব্যাদি সংগৃহীত হতো। স্থানীয় শহরের অধিবাসীরা তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সরবরাহ পেতো বণিকদের মাধ্যমে। আবার বনিক এবং ফেরিওয়ালার দল গ্রামবাসীদের জন্যও শহরের বাজার থেকে হরেক রকমের পন্য দ্রব্যাদি গ্রামে সরবরাহ করতো। যেমন- লবন, ধাতব দ্রব্যাদি, কাগজ, সৌখিন দ্রব্যাদি, কার্পাস বস্ত্র, চা, শহরের শিল্পজাত দ্রব্যাদি ইত্যাদি। শহরে এবং গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের ব্যবসা তদারকি করতেন পরোয়ানা প্রাপ্ত সরকারি দালালেরা। এরা সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসার উপর কর আদায় করতেন। তখন জলপথে ব্যবসা উল্লেখযোগ্য। ইয়াংজি ও হ্যান নদীপথে এবং পরে পশুচালিত গাড়ির সাহায্যে চা রপ্তানি হত মঙ্গোলিয়ায়। কিয়াংশির মধ্যে দিয়ে কোন পথে ফকিয়ে নে ফুকিয়েনের চা এবং আনহুই-এর রেশমজাত দ্রব্যাদি রপ্তানি হত ক্যান্টনে। নিংপো থেকে মাঞ্চুরিয়া পর্যন্ত এবং অ্যাময় থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত ব্যবসা চলতো চীন দেশীয় পথ সমূহের মাধ্যমে। এই পথ গুলি তীরভূমি সংলগ্ন হয়ে পাড়ি দিত। এইসব পথের মাধ্যমে মাঞ্চুরিয়া থেকে সোয়াবিন এবং বীনকেক আমদানি হত। এছাড়াও আমদানি হত গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলের উৎপন্ন দ্রব্যাদি।


• চীনের এই জলপথে ব্যবসা চলতো প্রাক আধুনিক পদ্ধতিতে অর্থাৎ দেশি পথের মাধ্যমে। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে আধুনিকতার প্রভাব পড়েনি। চা এবং রেশম যার রপ্তানি করা হতো, তা চিরাচরিত পদ্ধতিতে উৎপন্ন হতো না। তখন আমদানি করা দ্রব্যাদি চাহিদা এবং ব্যবসার জন্য মূলধনের যোগান ছিল সীমিত। তখন ধারে বিক্রয়ের সুযোগ ছিল না। তাম্র মুদ্রা এবং রৌপ বুলিয়নের চলন থাকলেও উভয়ের যোগান ছিল সীমিত। বণিকেরা সরকারি কর্মচারীদের অধীনে থাকতে অথবা তারা অর্ধ সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা গ্রহণ করে নিজেরাই একচেটিয়া কর আদায়কারী হিসেবে কর্তব্য পালন করতেন। তারা কোন লাভজনক উদ্যমে অর্থ বিনিয়োগ করতেন না। সরকার দেশের অর্থনৈতিক পুষ্টি সাধনের প্রতি বিষয় মনোযোগ দিতেন না। সরকার কৃষি থেকে প্রাপ্ত করের দিকে নজর দিয়েছিলেন। কিন্তু, নতুন মূলধনের সৃষ্টির দিকে নজর দিতেন না।


• দেশের শিল্প ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের উপযোগী উপকরণ হচ্ছে - শ্রমিকের পর্যাপ্ত যোগান, মূলধন সরবরাহ এবং প্রযুক্তি বিদ্যার প্রয়োগ। প্রাক আধুনিক চিনে জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান থাকায় পর্যাপ্ত শ্রমীকের অভাব ছিল না। কিন্তু তখন মূলধনের অভাব ছিল এবং প্রযুক্তিবিদ্যার অনুশীলন ছিল না। তাই স্বাভাবিক কারণেই তখন চীনের অর্থনীতি শিল্পভিত্তিক হয়নি।


• মোটকথা উনবিংশ শতকে শুরুতে চীনের অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় অর্থনীতি সমপর্যায় ভুক্ত ছিল না।

প্রথমত, তৎকালীন ইউরোপীয় প্রথম শাড়ির দেশ গুলির বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করত। অথচ চীন বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য আগ্রহশীল ছিল না। পড়ন্ত নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিবেচনা করে বহিবিশ্বের সঙ্গে পর্ন বিনিময়ে বিরত থাকতো। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও সম্যক রূপে প্রেরণা বা উৎসাহ পেত না।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিবিদ্যায় ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার এবং ব্যবহারে ইউরোপ যেভাবে অগ্রগতি লাভ করে চিনে, সেরূপ কোনো লক্ষণ দেখা দেয়নি। ঐতিহ্যমন্ডিত চীনা মন প্রযুক্তিবিদ্যা এবং যন্ত্রপাতির মূল্যায়নে থেকে নিঃস্পৃহ।

তৃতীয়ত, ইউরোপ বিশেষত বৃটেনের শিল্প ভিত্তিক অর্থনীতি প্রবর্তনে Entrepreneurship যেরূপ ভূমিকা গ্রহণ করে, সেরূপ ভূমিকা গ্রহণ রক্ষণশীল চিনে পরিলক্ষিত হয়।

• চীনের প্রাক আধুনিক অর্থনীতি আধুনিক রুপ পরিগ্রহ না করলেও সে অর্থনীতি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। জ্বলছেসের সুবন্দোবস্ত থাকায় চাউল উৎপাদিত হতো। দেশের অভ্যন্তরে যাতায়াতের উপযোগী যানবাহন ছিল। নিত্যকার ব্যবহার্য দ্রব্যাদি হস্তশিল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত হতো। এ জাতীয় অর্থনীতি চিনা জাতির দৈনন্দিন অভাব দূর করলেও দেশকে আধুনিকতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত রাখে।


আরো পড়ুন:- শত দিবসের সংস্কার আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ আলোচনা কর? CLICK HERE

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here