Click Below

Breaking

Know more

Search

সোমবার, ৮ আগস্ট, ২০২২

বলশেভিক বিপ্লবে লেনিনের অবদান আলোচনা কর || BA History Honours



প্রশ্ন, 

বলশেভিক বিপ্লবে লেনিনের অবদান আলোচনা কর।

অধ্যাপক স্টিফেন লি. ফ্রান্সের বিপ্লবী সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সাথে বিখ্যাত রুশ বিপ্লবী ও রাষ্ট্রনেতা লেনিনের তুলনা করে লিখেছেন যে, এই দুই ব্যক্তিত্ব প্রমাণ করেছেন কিভাবে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর গতিধারা ব্যক্তির ভূমিকার উপর নির্ভরশীল। লেলিনের অন্যতম অনুগামী লিও ট্রটস্কিও লেলিনের নেতৃত্বকারী প্রতিভার প্রশংসা করে লিখেছেন যে, ব্যক্তি ঘটনা পরম্পরা যোগসূত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ঐতিহাসিকেরাও স্বীকার করেন যে, লেনিনের নেতৃত্ব বলশেভিক বিপ্লবের সংগঠন ও সাফল্যের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ক্রিস্টোফার হিল লিখেছেন, "রুশ বিপ্লব ছিল লেনিনের বিপ্লব।" এ কথা ঠিক যে, সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া যেকোনো আন্দোলন ব্যর্থ হতে পারে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যথার্থ মূল্যায়ন এবং দলীয় সংগঠনকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে গণআন্দোলন সফল করা যায়। লেনিন তাঁর প্রতিভা, দক্ষতা ও সহজাত নেতৃত্বদানকারী ক্ষমতা দ্বারা ঠিক সেই কাজটি করেছেন। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি রাজনৈতিক, আর্থিক ও বহু্যাংশে মানসিক দিক থেকে বিপ্লবের অনুকূল ছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতিকে সঠিক সময়ে সঠিক পথে চালিত করেছিলেন লেনিন। তাই ঐতিহাসিক কার বলেছেন যে, লেনিন ছিলেন মহতের মাঝে মহত্বর। কেবল পূর্ব নির্ধারিত পরিস্থিতির তরঙ্গে গা ভাসিয়ে তিনি মহত্বে উত্তীর্ণ হননি। তিনি ছিলেন একধারে ইতিহাসের সৃষ্টি এবং ইতিহাসের স্রষ্টা।


• ১৯১৭ এর মার্চ বিপ্লবকে লেনিন বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে মনে করতেন। তবে এই বিপ্লবে তিনি দ্বৈত কৃতিত্বের অবস্থান লক্ষ্য করেছেন। একটি কর্তৃপক্ষ ছিল অস্থায়ী সরকার যারা বুর্জোয়া শ্রেণি ও বুর্জোয়া বিপ্লবের প্রতীক। অন্যদিকে ছিল পেট্রোগ্রাড ও অন্যান্য শহরের সোভিয়েত সমূহ, যাদের লেনিন সর্বহারা শ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের হাতিয়ার বলে মনে করতেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই দুটি কর্তৃপক্ষের সহাবস্থান সম্ভব হবে না। বুর্জোয়া বিপ্লব থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে উত্তরণের স্বাভাবিক মার্কসীয় তত্ত্বের প্রয়োগ রাশিয়ার ক্ষেত্রে সম্ভব হবে না বলেই লেনিন মনে করেন। কারণ স্টলীপিনের সংস্কার কৃষক শ্রেণীকে আত্মতুষ্টির জারকে দ্রবীভূত করে রেখেছিল। তাই তিনি সরাসরি শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবের সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তার কথা প্রচার করেন। তিনি বলেন যে, বলশেভিক দল শ্রমিক শ্রেণীকে বিপ্লব মুখী করে তুলবে। শ্রমিক সেনি বিপ্লবের স্রোতে যুক্ত করবে কৃষক শ্রেণীকে এবং চূড়ান্ত পর্বে এলে কৃষক শ্রেণীর বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়ক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এই কারণে লেনিন গোড়া থেকেই একটি সুশৃংখল রাজনৈতিক দল ও একদল নিবেদিত প্রাণ বৃত্তিমুখী বিপ্লবী সদস্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।


তিনি ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বলশেভিক দলকে দুটি লক্ষ্যে এগুলো নির্দেশ দেন।

প্রথমত, দলকে প্রকৃত অর্থে জনগণের নেতৃত্বকারী সংগঠনের পরিণত করার উদ্যোগ নিতে বলেন। এই কাজে বিশেষ দক্ষতা দেখান ট্রটস্কি। তিনি মনে করতেন যে, বাষ্প কে পিস্টল বাক্সে বন্দী করতে না পারলে যেমন তার শক্তি যথার্থ প্রয়োগ ঘটে না, তেমনি জনশক্তিকে একটি দলের নেতৃত্বে পরিচালিত করতে না পারলে বিপ্লব ঘটানো যায় না।

দ্বিতীয়ত, লেনিন বলশেভিক দলের বিপ্লবী ফ্রন্ট হিসাবে সোভিয়েত গুলিকে সামনে সারিতে আনার কথা বলেন। এজন্য তিনি সোভিয়েতের হাতে সকল ক্ষমতা অর্পণের তাত্ত্বিক দাবি তুলে ধরেন।


• ১৯১৭ সালের ১৬ এপ্রিল লেনিন সুইডেন ও ফিনল্যান্ড হয়ে রাশিয়াতে প্রত্যাবর্তন করেন। জার্মান সরকারের লক্ষ্য ছিল লেনিন কে রাশিয়া এনে অস্থায়ী সরকারের অন্তদ্বন্দ প্রকটতর করে তোলা। কিন্তু লেনিন জার্মানির দালাল হিসেবে কাজ করেনি। তিনি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে তড়ান্বিত করতে চেষ্টা চালান। অস্থায়ী বীর্য সরকার ও শ্রমিকদের সোভিয়েতের যুদ্ধ সংক্রান্ত বিতর্কের ফলে লেনিন তাঁর বিখ্যাত 'এপ্রিল থিসিস' ঘোষনা করেন। লেনিনের প্রত্যাবর্তনের ফলে বলশেভিক দলের শৃঙ্খলা ও ঐক্য ফিরে আসে। স্টিফেন লির মতে, লেনিনের ব্যক্তিগত নেতৃত্বকারী ক্ষমতা বলশেভিক দলকে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারি শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়। লেনিন তার এপ্রিল থিসিসে বলশেভিক দলের দ্বিমাত্রিক কর্মসূচি ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন যে, বল সে বৃত্তের দীর্ঘস্থায়ী স্থির বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রাখতে হবে। কিন্তু তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে স্বল্পকালীন নমনীয় মানসিকতা নিয়ে। সুনির্দিষ্টি উদ্দেশ্য বলতে লেমিন মার্চের বুর্জোয়া বিপ্লবে সর্বহারা শ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে উত্তরণের কথা বলেন। অন্যদিকে স্বল্প স্থায়ী কর্মসূচিতে কোন রূপ একগুঁয়েমি পরিহার করার কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির সাথে সাম্যতা করার এবং প্রয়োজনে তাদের কর্মসূচিতে হাত মেলানোর পরামর্শ দেন। এরই প্রতিফলন ঘটে কার্নিলভের বিদ্রোহ দমনের কাজে কেরেনস্কি সরকারকে বলশেভিক দের সাহায্যদানের মাধ্যমে। এর পাশাপাশি বলশেভিক দল তৎকালীন ধ্বংসাত্মক প্রবণতা গুলি কেও মদত দিতে শুরু করে। যেমন ইউক্রেনের আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী প্রবণতা কে তারা পরোক্ষ সমর্থন জানায়। লেনিনের লক্ষ্য ছিল নেতিবাচক শক্তির সাহায্যে সোভিয়েত বলশেভিক দলের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং অস্থায়ী সরকারের ভীত দুর্বল করা।


• এপ্রিল থিসিসে লেলিন সোভিয়েতের হাতে সকল ক্ষমতা তুলে দেওয়ার দাবি তোলেন। এই দাবি পূরণের লক্ষ্যে তিনি শ্রমিক সেনিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার অতি জনপ্রিয় ও কার্যকারী স্লোগান ছিল "শান্তি, রুটি ও জমি"। পেট্রোগ্ৰাড সোভিয়েত ইতিপূর্বেই দাবি তুলেছিল যে, ক্ষতিপূরণ ও রাজ্য গ্ৰাস ছাড়াই যুদ্ধের অবসান হোক। লেলিন বলেন যে, যুদ্ধের অবসান হলে শান্তি ফিরে আসবে। সৈনিকরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। শ্রমিক পাবে রুটি এবং কৃষক কবে জমি। বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদার ও চার্চের জমি বাজেয়াপ্ত করে কৃষকদের মধ্যে বন্টন করতে হবে। তাঁর আহ্বানে সৈনিক, শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণি উন্নততর জীবনের সম্ভাবনা দেখতে পায়। স্বভাবতই বলশেভিক দলের পতাকা তুলে সমবেদ হয় দেশের জনশক্তি। সপ্তম সর্বরাশিয়া সম্মেলনে লেনিনের থিসিস সম্পর্কে আলোচনা হয়। কিন্তু মেনশেভিক ও সোশ্যাল রেভ্যুলেশনারী সদস্যরা তীব্র বিরোধিতা করে। কিন্তু শ্রমজীবী শ্রেণী লেনিনের পক্ষ নেন। ১লা মে বিশাল শ্রমিক সমবেত লেনিনের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে দেয়। ধর্মঘট ও অবরোধে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অস্থায়ী সরকার কঠোর হাতে বলশেবিকদের দমন করতে উদ্ধত হয়। ট্রটস্কি কারারুদ্ধ হন। লেনিন পুনরায় ফিনল্যান্ডে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই সময় তাঁর "state and revolution" গ্রন্থটি রচনা সম্পূর্ণ হয়। এই পুস্তিকায় তিনি মেনশেভিকদের তীব্র সমালোচনা করেন। বিপ্লব ছাড়াই অস্থায়ী সরকারের পতন ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠান সম্ভাবনা সম্পর্কে মেনশেবিকদের ধারণাকে তিনি অমূলক বলে ঘোষণা করেন। এখানে তিনি নৈরাজ্যবাদীদেরও বিরূপ সমালোচনা করেন। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছাড়াই সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার নৈরাজ্যবাদী তত্ত্বকে লেনিন অলিক, কল্পনা বলে ব্যঙ্গ করেন। পক্ষান্তরে তিনি বুর্জোয়া সরকারের পরিবর্তে সর্বহারাদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিদের বিপ্লব করার আহ্বান জানান।


• কার্নিলভের বিদ্রোহ এবং সেই বিদ্রোহ দমনে বলসেবিদদের ভূমিকা লেলিন কে উৎসাহিত করে। তিনি ফিনল্যান্ডের থেকেই দলকে বিপ্লবের জন্য সংঘটিত হওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু বলশেভিকদের মধ্যে তখনো মতভেদ ছিল। জি.ই. জিনোভিয়েভ এবং এল.ভি.কামেনভ এই মুহূর্তে বিপ্লবের বিরোধিতা করেন। তাদের ধারণা ছিল যে, বলশেভিক দলের তখনই অস্থায়ী সরকারের মোকাবিলা করার অবস্থা ছিল না। কিন্তু দূরদর্শী লেলিন আর দেরি করতে রাজি ছিলেন না। তিনি ঘোষণা করেন, "we must not wait ! We may loose everything"- অনুগত সহযোদ্ধা ট্রটস্কির সাহায্যে তিনি বিপ্লবের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। নভেম্বরের ৬-৭ তারিখে বলছে বিপ্লবীরা অস্থায়ী সরকারের প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করে। সরকারি সেনাবাহিনী বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে অস্বীকৃত হয়। কেরেনস্কি সরকারের হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ৭ নভেম্বর লেলিন ঘোষণা করেন যে, দেশের ক্ষমতা এখন বলশেভিকদের কারায়ত্ব হয়েছে। সোভিয়েতের নেতৃত্বে বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল। স্বভাবতই সোভিয়েতের অন্তর্ভুক্ত বামপন্থী দলগুলির কোয়ালিশন সরকার গঠন প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু মেনশেভিক ও সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী দলের সদস্যরা বলশেভিক এই রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে সন্তুষ্ট ছিল না। তাই তারা সোভিয়েতের প্রথম অধিবেশন বয়কট করে। লেনিন এই সুযোগে কেবল বল সেবিকদের নিয়ে নতুন সরকার গঠন করেন। এই বিপ্লবী সরকার "সোভিয়েত অফ পিপলস কমিশন " নামে পরিচিত হয়। পরে অবশ্য অন্যান্য দেশত্যাগী বিরোধীরা সরকারে যোগ দেন।


আরো পড়ুন:- ইঙ্গ জাপান চুক্তির গুরুত্ব/ ফলাফল/ তাৎপর্য আলোচনা কর? CLICK HERE 

আরো পড়ুন:- লেলিনের নয়া অর্থনীতি ও পরিকল্পনা?CLICK HERE

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here