Click Below

Breaking

Know more

Search

বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০২২

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা কর? || B.A HISTORY HONOURS



প্রশ্ন,

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা কর?

টাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র বিশ্লেষণে ঐতিহাসিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই বিদ্রোহ প্রথম দিকে ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল তাতে কোন দ্বিমত নেই। প্রচলিত ধর্ম যেমন বৌদ্ধ, তাও এবং কনফুসীয় ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ তারা করেছিল। বিদ্রোহীরা মূর্তি পূজার বিরোধিতা করেছিল। তারা বৌদ্ধ মন্দির ও দেবদেবীর মূর্তি ধ্বংস করেছিল। বিদ্রোহীদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের এক সুগভীর প্রভাব ছিল। বিদ্রোহীরা চিনে এক ধর্মভিত্তিক স্বর্গীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু স্বভাবে দেখা যায় যে এই বিদ্রোহ ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।


পরবর্তীকালে বক্সার আন্দোলনের সঙ্গে টাইপিং বিদ্রোহের চরিত্রের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তাইপিং বিদ্রোহের চরিত্র ছিল মূলত মাঞ্চু শাসন বিরোধী ও খ্রিস্ট ধর্মের অবিরোধিতা। বিখ্যাত ভারতীয় নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায় তাইপিং বিদ্রোহের চরিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, প্রথম থেকেই বিদ্রোহীরা বিদেশের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিল। বিদেশীরা মাঞ্চু শাসক গোষ্ঠীকে সাহায্য না করলে তারা তাদের বাণিজ্যিক ব্যাপারে সুযোগ-সুবিধা দিতে রাজি ছিল। বিদেশীদের প্রতি তাইপিং বিদ্রোহের এই মনোভাব তাদের আন্দোলনের প্রগতিশীল চরিত্র কে পরিস্ফুটিত করেছিল।


এই বিদ্রোহ সকল প্রকার ব্যক্তি পূজা ও সমাজতান্ত্রিক প্রথার বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল। M.N.ROY - এই তাইপিং বিদ্রোহকে চিনে রিফরমেশন আন্দোলন বলে উল্লেখ করেছেন। এই বিদ্রোহের মধ্যে বুর্জোয়া ধণতান্ত্রিক বিপ্লবের আভাস পাওয়া যায়। M.N.ROY - এই বিদ্রোহকে একটি গনতান্ত্রিক আন্দোলন বলেছেন। তিনি ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে তাইপিং বিদ্রোহের অনেক মিল দেখিয়েছিলেন। কারণ ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে তাইপিং বিদ্রোহ নেতৃত্ব দিয়েছিল বুর্জোয়া শ্রেণী এবং পরবর্তী পর্যায়ে কৃষকরা এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল।


কিন্তু অনেকেই M.N.ROY -  এর বক্তব্যকে মানতে পারেনি। সমালোচকদের মতে তাইপিং বিদ্রোহের সময় চিনে অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সের মতো কোনো বুর্জোয়া শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল না। চীনে যে জেন্টি শ্রেণি ছিল তাদের কোন ভূমিকা এই বিদ্রোহে ছিল না। বরং বিদ্রোহের বিরোধিতা এই শ্রেণিই করেছিল। কারণ তারা বিদ্রোহীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। এ বিচারে তাইপিং বিদ্রোহকে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলা যায় না এবং ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে এই বিদ্রোহের কোনো মিল নেই সে অর্থে।


পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকেরা এই বিদ্রোহের চরিত্র সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এই বিদ্রোহের চরিত্র সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে ফ্রেড গ্রীন বলেছেন যে, তাইপিং বিদ্রোহ ছিল মূলত এক কৃষক বিদ্রোহ। তারা পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু না জেনেই পাশ্চাত্য চিন্তাধারা অনুসরণের চেষ্টা করেছিল।


চীনের সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিকদের চোখে তাইপিং বিদ্রোহ ছিল কৃষক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের নেতা হুং ছিলেন কৃষক পরিবারের সন্তান। তার সহযোগী বিপ্লবী যোদ্ধাদের অধিকাংশই ছিলেন কৃষক পরিবারভুক্ত। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার আগে চীনের কৃষকদের অবস্থা ছিল করুন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সে তুলনায় কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়েনি, তাই চিনে খাদ্য সংকর তীব্র আকার ধারণ করেছিল। বিদেশিদের সঙ্গে যুক্ত চীনের পরাজয় এবং তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান চীনের আর্থিক বিকাশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কৃষক শ্রেণীর উপর ধার্যকরের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এছাড়া জমি বন্টনে অসাম্য, মাথাপিছু কৃষি যোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় চীনের কৃষি কূল কে দুর্দশার চরম সীমায় এনেছিল। এই পরিস্থিতিতে হুং যখন বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন যখন চীনের কৃষক কুল সাড়া দিয়েছিল। তারা বিদ্রোহের সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চেয়েছিল।


চীনের কৃষকরা জমিদার, জেন্ট্রি শ্রেণি ও অত্যাচারী রাজকর্মচারীদের ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত ছিল। বিদ্রোহীরা এইসব শ্রেণীর উপর আক্রমণ করেছিল। বিদ্রোহীদের হাতে অত্যাচারী ও রাজকর্মচারীরা নিহত হয়েছিল। জমির দলিল, ঋনপত্রসহ জমিদারদের বহু নথিপত্র নষ্ট করা হয়েছিল। সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন চরম আঘাত এনেছিল। কৃষকদের স্বার্থে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। ধনী জমিদারদের বাড়ি লুণ্ঠন করে যেসব দ্রব্য বিদ্রোহীরা পেতো সেগুলোকে কৃষকদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হতো। বিদ্রোহীরা চীনের জমিগুলিকে জমিদার ও সামন্ত প্রভুর মধ্যে কুক্ষিগত বা সীমাবদ্ধ না রেখে সাম্য ভিত্তিক কৃষি সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের নীতি ছিল স্বর্গের নিচের সব জমিকে সকলকে মিলে চাষ করতে হবে। তাদের ভূমি সংস্কার নীতি কৃষকদের খুশি করেছিল এবং হুং কৃষকদের সমর্থন বা অনুগত্য পেয়েছিলেন। বিদ্রোহীদের সর্বতোভাবে কৃষকরা সমর্থন ও সহযোগিতা করেছিল। মাঞ্চু বাহিনী বিদ্রোহীদের দমনের জন্য অগ্রসর হলে তাদের প্রথম বাধা দিয়েছিল কৃষকরা। এসব দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় যে তাইপিং বিদ্রোহ চরিত্রগত দিক দিয়ে কৃষক বিপ্লবই ছিল। জার্মান পন্ডিত উলফ-গাং- ফ্রাঙ্ক যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে বিদ্রোহীদের প্রায় সকলেই ছিলেন দরিদ্র কৃষক শ্রেণী থেকে উঠে আসা হতাশ মানুষের দল।


কিন্তু অনেকেই তাইপিং বিদ্রোহকে মাঞ্চু অপশনের বিরুদ্ধে নিছক কৃষক বিদ্রোহ বলতে রাজি নন। 'ভিনসেন্ট ওয়াই সি' তার "The Tapping Ideology" গ্রন্থে স্পষ্টতখর সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, তাইপিং বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ বলা যায় না। তার মতে - তাইপিং বিদ্রোহীরা কৃষকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন ঠিকই। কিন্তু তারা তাদের উন্নতির ব্যাপারে খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন, তা বলা যাবে না। কৃষকদের আর্থিক সহ সার্বিক উন্নতির ক্ষেত্রে তাদের কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। ভূমিসংস্কার সংক্রান্ত কর্মসূচিকে তারা ঠিক মতো রূপায়ণ করেননি। জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ হয়নি, বরং জমিদার শ্রেণীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের অনেক সময় গোপন সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সব ভূমিহীন কৃষক জমি পেয়েছিল তা বলা যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা বিদ্রোহীরা কৃষকদের অত্যন্ত খারাপ চোখে দেখতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে স্বর্গীয় রাজার নির্দেশ ছিল, বিদ্রোহীদের কেউ দশ আদেশ অমান্য করলে তাহলে তাকে কৃষকে পরিণত করা হবে। এই নির্দেশেই প্রমাণ করে যে বিদ্রোহীরা কি চোখে কৃষকদের দেখতেন। সুতরাং এই বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ বলতে দ্বিধা আশাই স্বাভাবিক।


অনেকেই এই বিদ্রোহকে মাঞ্চু শাসন বিরোধী এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বলে থাকেন। এটা অবশ্য ঠিক যে আন্দোলনকারীরা মাঞ্চু শাসনের বিরোধী ছিলেন। বিদ্রোহীরা মাঞ্চুদের অপশাসনের হাত থেকে চিনা জনগণকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। মাঞ্চু শাসনের অবসান ঘটিয়ে তারা চিনে মহান স্বর্গ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। নানকিং-এ তারা যে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার পিছনেও জাতীয়তাবাদ সক্রিয় ছিল। তাইপিং বিদ্রোহের পিছনে জাতীয়তাবাদী প্রেরণা ছিল বলেই বহু জমিদার ও পন্ডিত এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। যেমন ওয়েই - চ্যাং - হুই ছিলেন জমিদার এবং শি-ডা-কাই ছিলেন পন্ডিত ব্যক্তিত্বের মানুষ। তাইপিং শাসনে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাইপিং শাসনে চীনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল। শান্তির স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা আধুনিক চীনের উত্তরণ ঘটান। জমির সম বন্টন, নারী জাতির কল্যাণ সাধন, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন, ডাক চলাচল ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যাংক ও রেলপথের প্রবর্তন, ধর্মীয় মন্দিরগুলিকে হাসপাতালে পরিণত করা ইত্যাদি কর্মসূচি প্রনয়ন - এই ইঙ্গিতই দিয়েছিল যে তাদের হাত ধরে চীন আধুনিক যুগে পদার্পণ করতে চলেছে। পরবর্তীকালে চীনের সাম্যবাদীরা তাইপিং বিদ্রোহের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।


এইভাবে দেখা যায় যে তাইপিং বিদ্রোহের চরিত্র সম্পর্কে পন্ডিতের মধ্যে বহু মতভেদ রয়েছে। অনেকেই এই বিদ্রোহকে মাঞ্চু অপশাসনের বিরুদ্ধে এক নিছক কৃষক বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন। উভয়পক্ষের মতামত কে পর্যালোচনা করার পরে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে তাইপিং বিদ্রোহের বহু কৃষক যোগদান করলেও এটা নিছক কৃষক বিদ্রোহ ছিল না। তাইপিং বিদ্রোহীরা যেসব সংস্কারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন সেগুলো তাদের প্রগতিশীল চিন্তাধারার পরিচয় দিয়েছিল। যাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব ছিল বলে এই বিদ্রোহ এক প্রকৃত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিদ্রোহে পরিণত হতে পারেনি। 


আরো পড়ুন - মাঞ্চু রাজবংশের শেষ পর্বের সংস্কার আলোচনা কর? CLICK HERE


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here