Click Below

Breaking

Know more

Search

সোমবার, ২৯ আগস্ট, ২০২২

মাঞ্চু রাজবংশের শেষ পর্বের সংস্কার আলোচনা কর? || B.A HISTORY HONOURS

 


প্রশ্ন,  

মাঞ্চু রাজবংশের শেষ পর্বের সংস্কার আলোচনা কর?

মাঞ্চু রাজবংশের শেষ পর্বের ইতিহাসকে 'ট্রাজিক পর্ব' বলে অভিহিত করা হয়। এই পর্বে ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন সাম্রাঞ্জী জুসি। সম্রাট কোয়াংসু বন্দি জীবনযাপন করতেন। ১৯০৮ সালে রানীর মৃত্যুর পর 'শুয়াং তুং' সম্রাট হন। এক ষড়যন্ত্রে সম্রাট কোয়াংসুকে হত্যা করা হয়। ১৯০১ থেকে রানীর নেতৃত্বে চীনের সংস্কার পর্ব শুরু হয়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লব পর্যন্ত তা চলেছিল। সংস্কারের সময়ে প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা, সামরিক ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক কাঠামো গঠনের উপর জোর দেওয়া হয়।


 মাঞ্চু সংস্কারের মধ্যে অন্যতম ছিল প্রশাসনিক সংস্কার। মাঞ্চু শাসকরা প্রশাসনকে দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতি মুক্ত করার জন্য প্রয়াস চালিয়েছিলেন। অপ্রয়োজনীয় কর্মহীন করনীক ও সহকারি পদগুলি বিক্রি করে মানসুরা অর্থ উপার্জন করত। এই অর্থনৈতিক প্রথা তুলে দেওয়া হয়। হুনান, হুপে ও কোয়াং টোং এর গভর্নরের পদ তুলে দেওয়া হয়। এরকম অপ্রয়োজনীয় 'ইয়েলো নদী' পরিদর্শক এবং খাল পরিদর্শকের পদ উঠে যায়। এর ফলে চীনা প্রশাসনের ব্যয় যেমন কমেছিল, তেমনি সরকারি কর্মচারীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল যে তাদের পরিণতি এইরকম হতে পারে। প্রশাসনকে গতিশীল করার জন্য এই সময় বাণিজ্যিক মন্ত্রক, বৈদেশিক মন্ত্রক, শিক্ষা মন্ত্রক, পুলিশ মন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারের একটি আইন পৃথক করা হয়, দৈহিক নির্যাতন কমানো হয়।


মাঞ্চু সরকারের আর্থিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সাফল্য ছিল অত্যন্ত সীমিত। কেন্দ্র ও প্রদেশ গুলির মধ্যে রাজস্ব বন্টন সংক্রান্ত ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে সুবিন্যস্ত বন্দোবস্ত গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিদারুণ ব্যর্থ হয়েছিল, তার সামান্য অংশই তেত কেন্দ্রীয় সরকার। তবে মাঞ্চু সরকারের আয় বেড়েছিল বাণিজ্য শুল্ক ও অন্ত সুল্ক থেকে। সারাদেশে আয় ব্যায়ের সঠিক হিসাব তৈরি করা হতো না। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে অর্থ মন্ত্রক নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়। এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে গোটা দেশে কর আদায় এর উপর একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। তার ভিত্তিতে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে একটি জাতীয় বাজেট তৈরি করা হয়। এই বাজেট অনুযায়ী মোট রাজেশের পরিমাণ ২৭৯ মিলিয়ন টেইল ব্যয় হয় ৩৭৫ মিলিয়ন, ঘাটতি ছিল ৭৮ টেইল। সরকার অর্থ বিভাগ, রেলপথ, শিল্প, ওজন পরিমাণ, কৃষক সংঘ ইত্যাদি সম্পর্কে আইন বিধি রচনা করে। অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বাজেট তৈরি, পরিসংখ্যান সংগ্রহ, কর ধার্য করার কাজগুলি কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের হাতে ছিল। তবে এদের কাজ কর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব হয়নি। সরকার শস্যের মাধ্যমে কর আদায়, রেলপথ নির্মাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সংস্কার করে। কেন্দ্র প্রদেশগুলির হাতে তামাক ও মাদক ক্ষেত্রে শুল্ক স্থাপনের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়। বাণিজ্য আইন বিধির একটি খরসা তৈরি করা হয়। এমনকি প্রাসাদের ব্যয় কমানো হয়।


চীনে মাঞ্চু রাজ বংশের শেষ পর্বে উল্লেখযোগ্য সংস্কার হলো শিল্প সংস্কার। এই পর্বে সর্বস্তরের শিক্ষা বিস্তারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। চীনে প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থা কে বাতিল করা হয়েছিল। জেলা, প্রদেশ ও রাজনীতিতে শিক্ষা বিস্তারের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। পুরনো শিক্ষা ব্যবস্থায় পশ্চিমি জ্ঞান-বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, পশ্চিমী বাস্তবীয় নীতি ইত্যাদি শিক্ষানীতির ব্যবস্থা হয়েছিল। গ্রামে প্রাথমিক, শহরে মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ স্থাপিত হয়। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। চীন থেকে ছাত্রদের বিদেশে অধ্যয়নের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ চীনের ঐতিহ্যগত পরীক্ষা ব্যবস্থা সমাপ্তি ঘটে। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে চীনে শিক্ষা মন্ত্রক চালু হয়েছিল। খ্রিস্টান মিশনারীরা চীনের উপকূলবর্তী শহর গুলিতে পাশ্চাত্য ধাছে কলেজ গড়ে তুললে চীনে শিক্ষা জগৎ-এ নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়। চীনে আধুনিক শিক্ষার প্রসার কেন্দ্রীয় সরকারের মতো প্রাদেশিক সরকারের ক্ষেত্রে জন্ট্রি শ্রেণি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার পরিণতিতে প্রায় এক লক্ষ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। দক্ষ শিক্ষকের অভাবের কারণে জাপান থেকে শিক্ষক এনে এই অভাব দূর করার চেষ্টা করা হয়। বহু চিনা ছাত্র জাপানে পড়াশোনা করতে গিয়েছিল। এইভাবে ১৯০১ থেকে ১৯০৬ এর মধ্যে চিনে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে।


চিনে শাসক গোষ্ঠী নেতাদের সামরিক দুর্বলতাকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে সামরিক সংস্কারের কাজে হাত দেয়। এক্ষেত্রে উদ্দ্যোগী ছিলেন লিউ-কুন-ই এবং চ্যাং-চি-তুং । তারা এই উদ্দ্যোগকে রুপাইত‌ করার জন্য সরকারের কাছে কতগুলি সুপারিশ পেশ করেছেন। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল গ্ৰিন স্ট্যান্ডার্ড বাহিনীর শক্তি হ্রাস করা। সামরিক বাহিনীর পশ্চাতে রণকৌশলে সুসজ্জিত করা, কেন্দ্রীয় বাহিনী গঠন করা। এর ভিত্তিতে সরকার উদ্যোগ জারী করেছিল।১৯০১ খ্রি: সামরিক পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল। সারাদেশে সামরিক অ্যাকাডেমি গঠন করা হয়েছিল। ইউয়েন সি কাই জার্মানি মডেলে জার্মানি প্রশিক্ষণ নিয়োগ করার উদ্যোগ নেন। এই বাহিনী সব দিক দিয়ে উন্নত ছিল। রাজধানী পিকিং এ সৈন্যবাহিনীর শিক্ষাদানের ব্যবস্থা হয়। সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বে মাঞ্চু শাসনের অবসান হয়েছিল এবং চীনে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এর পিছনে হিউয়েন শি কাইয়ের হাতে প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু তিনি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সমরতন্ত্রের সূচনা করে। এই কারণে ঐতিহাসিক ফেয়ার ব্যাংক , তাকে সমরনায়ক তন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলেছেন।


মাঞ্চু সংস্কারের পর্বে কয়েকটি সামাজিক সংস্কার সাধিত হয়।মাঞ্চু ও চীনাদের মধ্যে বিবাহ সরকারিভাবে অনুমোদন হয়। মেয়েদের পর্দা প্রথা রোধ হয় এবং আফিম খাওয়া নিষিদ্ধ হয়। চীনের সামাজে যে ঐতিহ্যের বহাল ছিল তা সংস্কারের দ্বারা শিথিল হয়েছিল। চীন ক্রমশ জাপানকে অনুসরণ করে এক আধুনিক রাষ্ট্রের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। জাপানের অগ্রগতি চিনার রাজনীতিবিদদের মুগ্ধ করেছিল। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অন্যান্য সংস্কার প্রবর্তনের কাজ শেষ হলে সাংবিধানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। যা মাঞ্চু রাজবংশের শেষ অবধি চলেছিল।


সমালোচনা - মাঞ্চু শাসকরা সংস্কারের মধ্যে দিয়ে রাজবংশকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কাঠামোগত ও মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো তাদের লক্ষ্য ছিল না, সংস্কারকদের আন্তরিকতার অভাব ছিল। মাঞ্চু রাজবংশ অনেক দেরিতে সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছিল। অনেক আগে এই কাজ শুরু হলে হয়তো কিছু সুফল পাওয়া যেত। তাই এত করেও শেষ পর্বে সংস্কারের মধ্যে চিনা বিরোধিতা মানসিকতার যে প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় তা চিনের বিপ্লবের জোয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।


আরো পড়ুন - চিনে বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি আলোচনা কর? (কারণ / প্রেক্ষাপট) CLICK HERE

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here