Click Below

Breaking

Know more

Search

বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০২২

দাঁতাত কি? দাঁতাত গঠনের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর || বিশ্বের দুই শক্তি কেন দাঁতাত গঠনে বাধ্য হয়েছিল || বিশ্ব রাজনীতিতে দাঁতাতের উদ্ভবের কারণ আলোচনা কর || History

 



প্রশ্ন, 

দাঁতাত কি? দাঁতাত গঠনের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর? 


অথবা 


বিশ্বের দুই শক্তি কেন দাঁতাত গঠনে বাধ্য হয়েছিল?


অথবা 


বিশ্ব রাজনীতিতে দাঁতাতের উদ্ভবের কারণ আলোচনা কর । 


উঃ -  আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা দাঁতকে একটি অনিবার্য কূটনৈতিক ব্যবস্থা বলে বিবেচনা করেন। তাদের বক্তব্য হলো তৎকালীন আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাতাবরণে দাঁতাত একটি অবসম্ভাবি প্রক্রিয়া। বিশেষত বিংশ শতাব্দীর সাতের দশকের মধ্যভাগে সোভিয়েত ও আমেরিকা বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়ে উভয়ই উত্তেজনা প্রশনে সমাধান সূত্র খুঁজে বার করার চেষ্টা করেন। এই দুটি প্রধান শক্তির বাধ্যবাধকতায় বেশ কয়েকটি কারণে দাঁতাতের সূচনা হয়।


প্রথমতঃ- নানা কারণে আমেরিকা দাঁতাতে আগ্রহ দেখেছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যয়ভার প্রাধান্য বিস্তারে মার্কিন নীতি সম্পর্কে মার্কিনদেরই সন্ধিহান করে তুলেছিল। তাছাড়া তৈরি হয়েছিল এক বিরাট অভ্যন্তরীণ চাপ, যাকে অগ্রাহ্য করা মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইতিমধ্যে ইউরোপের অনেক দেশ যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠায় মার্কিন লগ্নী ও পুঁজির রপ্তানি কমে যায়। তৃতীয় বিশ্বে আমেরিকার উপর পাল্টা চাপ তৈরি করেছিল। তৃতীয় বিশ্বের মূলধন লগ্নী করার ব্যাপারে ইউরোপের অনেক দেশ আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল। তারা কমন মার্কেট তৈরি করেছিল। এর ফলে জাপানের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলত অর্থনৈতিক দিক থেকে জাপানকে আমেরিকার জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে দেখা যায়। আমেরিকার- "উগ্র ইজরাইল নীতি" - আরব জগতের অসন্তোষ বৃদ্ধি করেছিল। এই সমস্ত কারণে আমেরিকা দাঁতাতের কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছিল।


দ্বিতীয়তঃ- দাঁতাত প্রক্রিয়া চালু রাখতে সভিয়েত রাশিয়াও বাধ্য হয়। এই পর্বে সোভিয়েত রাশিয়া বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মধ্যে দিয়ে চলেছিল। চূড়ান্ত সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ ও মস্কোয় আধিপত্যবাদের ভিত্তি পূর্ব ইউরোপ সহ বিশ্বের অন্যান্য কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলির ভালো চোখে দেখছিল না। মস্কোয় আধিপত্যবাদের ভিত্তি আলোচ্য সময়কালে হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভিয়ার সোভিয়েত কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনসাধারণ উদারীকরণের দাবিকে সামনে রেখে বিদ্রোহ শুরু করে। সত্তর দশকে পোল্যান্ডের অস্থিরতা সোভিয়েত রাশিয়াকে টালমাটাল করে তুলেছিল। সাম্যবাদী চীন ও সোভিয়েত সম্প্রসারণ নীতি - ক্রুশ্চেভ এর মতে নেতার মনোভাব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। এতে চীন ও সোভিয়েতের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। এই সময় চীন পুঁজিবাদী আমেরিকার সাথে সুশাসনে যত্নবান হয়ে ওঠে, যা রাশিয়াকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছিল। 


এছাড়া সোভিয়েত রাশিয়া প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নতুন ভোগবাদীর সমাজে চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। কার্যত পশ্চিমী বাজার অর্থনীতির তুলনায় সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়ে। কৃষি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও যৌথ মালিকানা কার্যত ব্যর্থতায় পর্যভূষিত হয় । এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ শতকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সোভিয়েত দেশ কালক্রমে পশ্চিমী সাহায্যের প্রত্যাশী হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় দাঁতাতের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।


তৃতীয়তঃ - পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়ে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভীত ছিল। তাই ভয়াবহ পারমানবিক যুদ্ধের ভিত্তি দুইপক্ষকে নিজেদের কাছাকাছি আনতে বাধ্য করেছিল। বস্তুত সমরাস্ত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতা ও ব্যয় বৃদ্ধি দাঁতাদের বিকাশ সহায়ক হয়েছিল। অতঃপর উভয়পক্ষই বুঝেছিলেন যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার রাশ টানা না হলে একদিকে যেমন তাদের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করবে না, তেমনি অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করবে। এছাড়া ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হতে থাকে। আর এই সংক্রান্ত গবেষণা চলেছিল ইসরাইল, আফ্রিকা, ভারত ও পাকিস্তান। যেকোনো ছোটখাটো উত্তেজনা থেকে পারমাণবিক সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে তা দুই শক্তিধর রাষ্ট্র বুঝতে পেরেছিল। তাই দুই পক্ষই দাঁতাত প্রক্রিয়া অংশগ্রহণে বাধ্য হয়।


চতুর্থতঃ- শান্তিপূর্ণ সহবাস্থান নীতির প্রবক্তা ' নিকিতা ক্রুশ্চেভ ' সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতিকে পরিচালনা করেন। পারমাণবিক যুদ্ধের ভয় এবং ক্ষয়ক্ষতি এই দুই শক্তিকে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার নীতিতে আস্থাশীল করে তুললে দাঁতাতের আবির্ভাব ঘটে।


পঞ্চমতঃ- তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীন দেশ গুলি তাদের জোট নিরপেক্ষতা নীতি দ্বারা যাতায়াতের আগমনের পথকে সুগম করে তোলে। সদ্য স্বাধীন দেশগুলি শান্তিপূর্ণ সহবাস্তার নীতি অনুসরণ করতে থাকে। এই দেশগুলি তাদের অনুকূলে বিভিন্ন জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। জোট নিরপেক্ষ নীতির প্রভাবে বৃহৎ শক্তির মধ্যে চলে আসা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশমনে আসতে বাধ্য করেন। 


ষষ্ঠতঃ- 1960 এর দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহু মেরু তার উত্থান দাঁতাত ত্বরান্বিত করে। আমেরিকা ও রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও তৃতীয় প্রধান শক্তি হিসেবে পরিণত হতে থাকে। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফ্রান্স ব্রিটেন পশ্চিমি ক্ষমতার দিক থেকে আমেরিকাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি আমেরিকার নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য ছিল না। একইভাবে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী শিবিরের অভ্যন্তরে একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। 'আলবেনিয়া' - সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিহত করতে এগিয়ে আসে। একই চীনে সোভিয়েত দ্বন্দ্ব দেখা দিলে সোভিয়েত রাশিয়াও সহনশীল হয়ে ওঠে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ মার্কিন মিত্রতার পথ অনুসরণ করে। দাঁতাতে প্রাক্কালে বিশ্বে একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্রের উদ্ভব ঘটেছিল। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি নিজেদের মধ্যে অভিন্ন অর্থনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে উঠে আসছিল। ল্যাটিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি পৃথক পৃথকভাবে তাদের অস্তিত্ব প্রকাশ করেছিল। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে জাপানেরও উত্থান ঘটেছিল। কোরিয়া, ইসরাইল একই পর্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বহুমেরুতা তাদের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল।


সপ্তমতঃ- গর্ভচকের গ্লাস নস্ত ও পেরেস্ত্রইকা তত্ত্বে সমাজতন্ত্রবাদের সমালোচনা করে ধনতন্ত্রের সঙ্গে আপোসের আভাস দেওয়ায় আমেরিকা স্বস্তি লাভ করে। তিনি আমেরিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটাতে চান। ফলে ঠান্ডা লড়াইয়ের বদলে সূচিত হয় - দাঁতাত। গর্ভচকের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন একভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়েছিল।


উপরিক্ত কারণগুলি ছাড়াও দাঁতের সূচনার অন্যান্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যায়, এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পক্ষে চীনের মত গুরুত্ব পূর্ণ শক্তিও সদয় ছিল। তাই এই পর্বে চীন যেমন ভিয়েতনামে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধী তেমনি সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে নানা কারণে তার সম্পর্কের অবনতি বিষয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। এর থেকে পরিত্রাণের সহজ উপায় ছিল আলাপ আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিও দাঁতাত চেয়েছিল, কারণ পারমানবিক যুদ্ধ বাঁধলে তারাই সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। পশ্চিম জার্মানি চ্যান্সেলর উইলিল্যান্ড 1969 সালে পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সাথে সম্পর্কের উন্নতির জন্য - "Ost-politik" নীতি গ্রহণ করেন। এই নীতি বিবাদমান দুই শক্তিকে উত্তেজনা প্রশমনে এগিয়ে আসতে বাধ্য করে।


আরো পড়ুন - ত্রিশক্তি আঁতাত কিভাবে গড়ে ওঠে? CLICK HERE




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Click Here